Tuesday, May 17, 2016

কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ উপলক্ষে অর্জুন গীতার উপদেশাবলি প্রাপ্ত হয়। যুদ্ধক্ষেত্রে যখন দুই পক্ষ রণক্ষেত্রে সুসজ্জিত, তখন অর্জুন দেখতে পায় উভয় দিকে যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছে তার পিতৃব্য, পিতামহ, আচার্য্য, মাতুল, ভ্রাতা, পুত্র, পৌত্র, সখা প্রভৃতি সমস্ত আত্মীয়স্বজন। এই যুদ্ধ সংঘটিত হলে তার বংশ বিনাশ ছাড়া আর অন্য কিছু হবে না। তখন অর্জুন ভগবান শ্রী কৃষ্ণ কে বলে, 'বংশের কাউকে হত্যা করলে শাস্ত্র মতে কুলক্ষয় দোষ হয়। কুল ক্ষয় দোষে দোষী হলে কুল ধর্ম নষ্ট হয়, কুল ধর্ম নষ্ট করলে কুলের স্ত্রী গণ ব্যভিচারিণী হয়, কুলের স্ত্রীগণ ব্যভিচারিণী হলে বর্ণ সংকর হয়। কোন ব্যক্তি এই দোষে দোষী হইলে সে কুল নাশকারী হিসেবে সে সহ তার সমস্ত পিতৃপুরুষ নরকে পতিত হয়। আমি এই মহাপাপের অনুষ্ঠান করতে পারব না। এই গুরুতর অপরাধ করা থেকে ধৃতরাষ্ট্র যদি আমাকে মেরেও ফেলে তাও আমার জন্য কল্যাণকর। আমি প্রয়োজনে ভিক্ষা করে খাব। আমার এই রাজ্যের দরকার নেই। আমি এই যুদ্ধ করতে পারবো না।'

নির্দয় ভগবান শ্রী কৃষ্ণ তখন তাকে অর্জুন কে বলে, 'তোমার বুদ্ধি কম, শাস্ত্রের কথা বোঝার মত তোমার মেধা পরিপক্ব হয়নি। পণ্ডিত ব্যক্তি কি জীবিত কি মৃত কোন ব্যক্তির জন্যই পরিতাপ করে না। আর জীবের আত্মাই হল সব। আত্মা আগুনে পুড়ে না, জলে ভেজে না। আত্মা অবিনশ্বর। এর ক্ষয় নাই বিনাশ নাই। যে মনে করে জীবাত্মাকে বিনাশ করা যায় তিনি অনভিজ্ঞ। জীবিত ব্যক্তির মৃত আর মৃত ব্যক্তির জন্ম অপরিহার্য। অতএব তুমি শোক করা বাদ দিয়ে অত্যন্ত আনন্দ সহকারে জ্ঞাতিবর্গকে সমূলে হত্যা কর। এতে কেবল শরীর নষ্ট হবে আত্মার কিছু হবে না।'

শ্রী অর্জুনকে আরও বলে,'তুমি এমন মহারথী হয়ে যদি যুদ্ধ না করো তবে তুমি অন্য সকলের দ্বারা তিরস্কৃত হবে। তোমার মত ব্যক্তির তিরস্কৃত হওয়ার চেয়ে মৃত্যু শ্রেয়। তাছাড়া তুমি যুদ্ধে জিতলে তুমি পৃথিবী উপভোগ করবে আর হারলেও তোমার জন্য স্বর্গ নিশ্চিত। দুই দিকেই তোমার লাভ। অতএব এই যুদ্ধ তুমি কর। করলেই তোমার জন্য লাভ আর লাভ। জয় পরাজয়ের কথা না ভেবে একাগ্র চিত্তে কাজ করে যাওয়াই কর্তব্য''। 'পুরুষ কর্মানুষ্ঠান না করলে জ্ঞান প্রাপ্ত হয় না এবং জ্ঞান প্রাপ্ত না হলে কেবল সন্ন্যাস দ্বারা সিদ্ধি লাভ করতে পারে না। '

কৃষ্ণ আরও বলে, ''প্রথমে বিষয়চিন্তা, চিন্তা হতে আসক্তি, আসক্তি হতে অভিলাষ, অভিলাষ হতে ক্রোধ, ক্রোধ হতে মোহ, মোহ হতে স্মৃতিভ্রংশ, স্মৃতিভ্রংশ হতে বুদ্ধিনাশ, বুদ্ধিনাশ হইতে বিনাশ উপস্থিত হয়। 'পুরুষ আসক্তি পরিত্যাগ করে কর্মানুষ্ঠান করলে মোক্ষ লাভ করেন।' তুমি লোকদিগের ধর্মরক্ষণার্থ কর্মানুষ্ঠান কর।'

যদিও এখানে বিষয় চিন্তা মোহ ত্যাগ করতে বলা হয়েছে তবুও শ্রী কৃষ্ণ নিজেই অন্য জায়গায় অর্জুন কে স্বর্গের লোভ এবং রাজ্যের লোভ দেখিয়ে যুদ্ধে অবতীর্ণ হওয়ার কথা বলেছেন। গীতার এক জায়গায় বলা হয়েছে লোভ ত্যাগের কথা আরেকবার দেখানো হয়েছে বিভিন্ন ধরনের লোভ। এটা নিঃসন্দেহে শ্রী কৃষ্ণের পরস্পর বিরোধী বক্তব্য। অপরদিকে যদি ধর্মরক্ষার্থেই যুদ্ধ করার কথা কৃষ্ণ বলে থাকে, তবে কুল ধর্ম বিনষ্ট করলে ধর্ম নষ্ট হবে সেটা আগেই বলা হয়েছে। এরপর ও যদি যুদ্ধ করতে হয় তবে অর্জুন স্বর্গপ্রাপ্ত হতে পারে না। কারণ কেউ কুল বিনষ্ট ধর্ম নষ্ট হয়, আর ধর্ম নষ্ট হলে কিভাবে পুর্বপুরুষ সহ নরক প্রাপ্ত হয় তা উপরে বলা হয়েছে।

এইসকল যুক্তি দেখে পড়ে বুঝে হিন্দু উপাসকেরা নিষ্ঠুর নির্দয় শ্রী কৃষ্ণের মত ভগবান কে উদার, দয়াবান, শ্রেষ্ঠ জানতে বা মানতে বা বলতে তারা পিছপা হয় না। এইসব উপদেশ শ্রবণ করে সম্পত্তির জন্য হিন্দু উপাসকেরা পিতৃ হত্যা, বংশ নির্মূল করার মত গর্হিত কাজের মধ্যেও মহত্বতা খুঁজে পান। ধর্ম যুদ্ধ বা ধর্ম রক্ষার্থে বিভিন্ন অজুহাতে যুদ্ধ করার কথা বলা হলেও, মূলত এই যুদ্ধটা ছিল অর্থ রক্ষা রাজ্য রক্ষা আর বিষয়াদি রক্ষার যুদ্ধ।

Thursday, May 5, 2016

ভগবান শ্রী কৃষ্ণের বিভিন্ন কার্যকলাপ অনুসারে তার ভিন্ন ভিন্ন নাম আছে। যেমন, মধু নামক দানবকে সংহার করার জন্য তার নাম মধুসুধন, গাভী ও ইন্দ্রিয়গুলোকে আনন্দ দান করেন বলে তার নাম গোবিন্দ, বসুদেবের পুত্ররূপে অবতীর্ণ হয়েছিলেন বলে তার নাম বাসুদেব, দেবকীর সন্তানরূপে অবতীর্ণ হয়েছিলেন বলে তার নাম দেবকীনন্দন, বৃন্দাবনে যশোদার সন্তানরূপে তিনি তার বাল্যলীলা প্রদর্শন করেন বলে তার নাম যশোদানন্দন এবং সখা অর্জুনের রথের সারথি হয়েছিলেন বলে তার নাম পার্থসারথি। সেই রকম, কুরুক্ষেত্রের রণাঙ্গনে অর্জুনকে পরিচালনা করেছিলেন বলে তার নাম হৃষীকেশ।
সমস্ত জীবের ইন্দ্রিয় এবং মনের নিয়ন্তা হইলেন ভগবান শ্রী কৃষ্ণ। শয়নে স্বপনে জাগরণে ভক্ত ভগবানের নাম স্মরণ করলেই ভগবান সন্তুষ্ট হোন। জীবেরা হচ্ছে তার অবিচ্ছেদ্য অংশ, তাই জীবদের ইন্দ্রিয়গুলি ভগবানের অবিচ্ছেদ্য অংশ। সমস্ত জীবের অন্তরে অবস্থান করে ভগবান তার ইন্দ্রিয়গুলি পরিচালিত করেন।তবে এটা নির্ভর করে আত্মসমর্পণের উপর। শুদ্ধ ভক্তের ক্ষেত্রে ইন্দ্রিয়গুলি ভগবান প্রত্যক্ষভাবে পরিচালিত করেন। ভগবানের ভক্ত অর্জুন এক মুহূর্তের জন্যও শ্রী কৃষ্ণ কে স্মরণ থেকে বিস্মৃত হতেন না। একারণেই কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে তিনি অর্জুনের ইন্দ্রিয়কে নিজে পরিচালনা করেছিলেন।
কিন্তু এখন কথা হলো, এই যে বাংলাদেশে মুসলিমদের দ্বারা ভগবান ভক্ত হিন্দুরা প্রতিনিয়ত নির্যাতিত হতে হতে শূন্যের কোঠায় পৌঁছচ্ছে, কোথায় এখন কৃষ্ণের সেই রুদ্রমূর্তি? কোথায় কৃষ্ণের লীলাখেলা? নাকি তার সমস্ত দৈবশক্তি সেই সময়ের জন্য প্রযোজ্য ছিল, বর্তমানের জন্য না? এর দুইটা কারণ হতে পারে। এক বাংলাদেশের হিন্দুরা তাদের জপ যজ্ঞ পূজা প্রার্থনা দ্বারা হয় কৃষ্ণকে খুশি করতে পারে নাই; মানে তারা সহি কৃষ্ণ প্রেমিক হইতে পারে নাই। আর না হলে কৃষ্ণ এতদিনে তার সমস্ত রবোটিক পাওয়ার নিয়ে মরে ভুত হয়ে গেছে। যে কারণে তার কোন রকম ক্রিয়াকলাপ আমরা বর্তমানে দেখতে পাচ্ছি না। তাই যারা এখনো 'হরে কৃষ্ণ' জপে জপে মুখে ফেনা তুলেছেন আসলে তা 'হরে ভুত' বলে ভগবানের দরবারে জমা হচ্ছে।
'হরে কৃষ্ণ' থুক্কু 'হরে ভুত'।
খইসিলাম সরকারের মুকে আমি মুতি। এরফরে অনেকেই খাঁড়ায় মুতার জন্য পরামর্শ দিয়েছেন। এমনকি বিভিন্ন মেশিন দিয়ে বুঝিয়ে দিয়েছেন খাড়ায়া কেমনে মুতা যায়। এরা ধরেই নিয়েছে মুতা মানেই খাড়ায়া মুতা, এবং এইটা যথেষ্ট গর্বের বিষয়। আমি সরকাররে শুয়াইয়া হেরফরে মুখের উপ্রে খাড়ায়া দুই পা দুই দিখে দিয়া বা বইসা যেমনে ইচ্ছা তেমনে মুতুম, এতে তোদের এত্তো সমস্যা কুতায় বুঝলাম না। মাইয়ারা খাড়ায়া মুততে ফারে না কইলো কিডাই? হেরা খাড়ায়া শুইয়া বইসা যেমনে ইসসা তেমনে মুঠবো, টেনশনটা যেন ফুরষদের হেইসব মুত ফরিশকার করতে হইবো! আগেও দেখেছি পোলাগোর রাস্তাঘাটে যেখানে সেখানে খাড়ায়া মুতা নিয়ে খুব শেয়ানা ফিল করে। আইচ্ছা খাড়ায়া মুতা কি গর্বের বিষয়? যদি হয় তাইলে কুত্তাও খাড়ায়া মুততে ফারে। কুত্তারেও আন্তর্জাতিক ভাবে একঠ্যাংগে খাড়ায়া মুতার জন্য এওয়ার্ড দেওয়া দরকার। ভাই সাপেরা আফনারা এক ঠ্যাংগে না, কুত্তার সাথে জিততে হলে দুই ঠ্যাংগ উঠায়া মুইত্তা দেখান। তাইলেই বুঝবাম আফনেরা জিইতা গেছেন।
ভিন্ন প্রসঙ্গঃ খাড়ায়া মুতা গর্বের বিষয় হইলে, তোদের গালের জংলী বাল ফাল মাইয়াগোর মত ক্লিন সেইভ হইতে যাওয়া অত্যন্ত লইজ্জ্যার বিষয়। আরো লইজ্জ্যার বিষয় হইলো নিজেগোড় বুখের মইধ্যে মাইয়াগোড় মত ইস্তন বাইনাইতে পারলি আজ পর্যন্ত। কুনু একটা বাইচ্চা জন্ম দিতে ফারলি না একজনও, তোরা একটা খাড়ানোড় বাচ্চাও কুনু মানুষরে দুধ খাওয়াইয়া আইজ ফর্যন্ত বাছায়া রাখতে ফারলি না । আরো আরো আরো লইজ্জার বিষয় হইলো নিজেগোর ইমানদন্ড টা আরো কয়েক ইঞ্চি বাড়াইয়া নিজের পিছন দিকে ঢুকাইয়া স্বাবলম্বী হইতে পারলি না। এর জন্য রাস্তা ঘাটে নারী, শিশু, বাচ্চা, মুরগী গরু যেইখানেই যার ফোঁটা পাস সেইখানেই বিসমিল্লা বইলা আল্লার নামে ঢুকায়া দেস, ছি কি লইজ্জা। কি লইজ্জা!
মাতৃত্ব আর ঋতুস্রাব এই নিয়ে অনেকরেই পুতুপুতু টাইপ শালপার্টি ঠ্যাটাচ দিতে দেখা যায়। অনেকই পিরিয়ড আর মাতৃত্বের দুঃখ কষ্টের কথা তুলে এইটাকে ঐশ্বরিক পর্যায়ে নিয়ে সমবেদনা কামনা করে। যেমন মসজিদের পোলাপান আল্লার ঘরের জন্য সাহায্য ছায়। মেয়েরা মায়ের জাত এই বইলা পুরুষেরা নাকমুখচোখপানি সম্মান নারীকে দিয়ে থাকে, উচিত পাওনা দেওয়ার নামে ঠনঠন।
ঋতুস্রাব আর গর্ভধারণ এইটা শারীরিক শরীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়া। প্রকৃতিগত ভবে এইটা নারী পাইছে। পুরুষ পাইলে পুরুষও সন্তান ধারণ করতে পারতো। পুরুষ সন্তান পয়দাকরতে পারে না বলে তার হীনমন্যতা বোধের কিছু নাই বা তার এতে অসম্মানের কিছু নাই। ঠিক তেমনই নারী পারে বলে তার গর্বের কিছু নাই বা সম্মানেরও কিছু নাই। যদি নারীরে সম্মান দিতে হয় তবে তার প্রাপ্য সম্মান দেন, নারীর সম্মান বিবেচিত হইবে তার কাজে। লুলা ল্যাংড়ার মত শরীরবৃত্তীয় সক্ষমতা আর অক্ষমতা দিয়ে মানুষের সম্মান বিবেচনা দেখলে আমার ঘেন্না লাগে।
যদি একান্তই ছান তবে নারীকে মানুষ হিসেবে দ্বিতীয় লিঙ্গ পরিচিতি বাদ দেন। তাকে তার প্রাপ্য ঠিক মত দেন। তাকে তার অধিকার দেন। তাকে বিবেচনা করুন তার কাজের ভিত্তিতে। মা হইতে পারে আর মাসিক হয় বলে নারীরে সম্মানের কিছু নাই। এইটা মায়ের পায়ের নিচে সন্তানের বেহেস্তে নাম কইরা বেহেস্তে গিয়া সমস্ত সুবিধাদি যেমন পুরুষের, তেমনি জগতে নারীর মায়ের জাতি বইলা সমস্ত সুবিধাদি পুরুষের ভোগের মত নাকের আগায় একটা মুলা ঝুলানো ছাড়া অন্য কিছু না।
কাইল খইছিলাম, খাড়ায়া পেশাব যদি সম্মানের হয় তবে বাইচ্চা জন্মদান ও মেয়েদের জন্য সম্মানের। মানুষরে শরীরের উপাদান বা মাংস কম বেশি দিয়ে বিচার না কইরা কাজ দিয়ে মানুষ হিসেবে বিচার করতে শিখুন।
শ্রীকৃষ্ণ বলেছেন- 'চাতুর্বর্ণ্যং ময়াসৃষ্টম্' (গীতা,৪/১৩) - চার বর্ণের সৃষ্টি আমি করেছি।
এইখানে গুণের মাধ্যমে আমি কর্মকে আলাদা করেছি, 'গুণকর্ম বিভাগশ:' বলে যারা ত্যানা প্যাঁচাইতে আসবেন, তারা অনুগ্রহ করে বলিবেন কার কর্মগুণে অর্জুন ক্ষত্রিয় বর্ণে জন্মেছিল?
এখন আপনি বলতে পারেন, ভগবান কাকে কি রূপে পাঠায়, কাকে কোন বর্ণে জন্মদান করায় সেটা বুঝা ভার। এটা ভগবানের পরীক্ষা। ঠিক যেমন সোমালিয়ার খেতে না পাওয়া জীর্ণ শিশুটিকে দেখে আপনার মন ভগবানের প্রতি ভালবাসায় ভরে যায় এই ভেবে যে, তিনি আমাদেরকে তাদের থেকে কত ভাল রেখেছেন; সব ভগবানের কৃপা। আপনার মনে এই প্রশ্নটা কিন্তু আসে না, ভগবান কেন সৃষ্টিতে বৈষম্য তৈরি করেছেন? অথবা নেপালে ভুমিকম্প হলে আপনি ভগবানের প্রতি তুষ্ট থাকেন এই ভেবে যে, ভগবান আপনাকে কৃপা করেছেন। তেমনি আপনি নিচু জাতে জন্মালে আপনি ভাবেন ভগবানের পরীক্ষা, আর উঁচু জাতে জন্মালে ভগবানের কৃপা। একবার মনে প্রশ্ন আসে না, জাতপাতের তৈরি করে মানুষে মানুষে এই গণ্ডগোলের কি দরকার ছিল?
গীতার মত একটা মহাবর্ণবাদী গ্রন্থ উদার হয় কি করে?
আত্মা এক দেহ থেকে আরেক দেহে প্রতিস্থাপন হয়। আমাদের পোশাক পুরাতন হয়ে গেলে বা ছিঁড়ে গেলে আমরা যেমন এক পোশাক ফেলে দিয়ে নতুন পোশাক পরি তেমনই আত্মা এক দেহ মরে গেলে অন্য দেহে প্রতিস্থাপন হয়। আত্মার এসব বিষয়ে প্রশ্ন তোলার পরে হিন্দু পাঁঠারা এসে শক্তির অবিনাশীতাবাদ সূত্র তুলে ধরে আত্মার দেহান্তর সত্য বুঝাতে চাচ্ছে। এইখানে আমরা একটু শক্তি কাকে বলে আর অবিনাশীতাবাদ সূত্রটা কি একটু দেখে নেই।
শক্তি কাকে বলে? পদার্থবিজ্ঞানের ভাষায় শক্তি বলতে কাজ করার পরিমানকে শক্তি বলে। কাজ বা কার্য হচ্ছে বল ও বলাভিমুখী সরণের গুণফল। কৃতকাজের পরিমাণ দিয়েই শক্তি পরিমাপ করা হয়। অর্থাৎ বস্তুর শক্তি হচ্ছে ঐ বস্তু মোট যতখানি কাজ করতে পারে। যেমন আমি বিশ কেজির একটা বস্তা উঠাতে পারি আপনি পারেন না, আমি দশ ঘণ্টা টানা দাঁড়িয়ে থাকতে পারি, আপনি পারেন না । এখানে হলো আমার আপনার শক্তির পার্থক্য। আমরা যেমন সময় পরিমাপ করি সেকেন্ডে, দৈর্ঘ্য পরিমাপ করি মিটারে, কোন বস্তুর ভর মাপি কিলোগ্রামে, তেমনই শক্তি মাপার ও একক আছে তাকে বলে জুল। কোন বস্তুর শক্তি বেশি কোন বস্তুর কম। শক্তির আবার বিভিন্ন রূপ আছে যেমন যান্ত্রিক শক্তি, তড়িৎ শক্তি, আলোক শক্তি, রাসায়নিক শক্তি, সৌর শক্তি ইত্যাদি। যেমন পানি গরম করতে তাপ শক্তি লাগে, বিদ্যুৎ জ্বলাইতে আলোক শক্তি লাগে, গান গাইতে শব্দ শক্তি লাগে। এখন আপনি চাইলেই আলোক আর তাপ শক্তি দিয়ে গান গাইতে পারবেন না। শক্তি প্রাপ্ত হতে হলে যে প্রাণ থাকতে হবে এমনও কোন কথা নাই। গাড়ির ইঞ্জিন নিষ্প্রাণ হইলেও এতে শক্তি সঞ্চারিত হয়, ইস্ত্রি নিষ্প্রাণ হইলেও আমরা তাপের দ্বারা কাপড় সোজা করি। সুতরাং দেখা যাচ্ছে শক্তির সাথে প্রাণ বা আত্মা, জীবন, মরণের কোন সম্পর্ক নেই। যে কোন জড় বস্তুও শক্তি প্রাপ্ত হতে পারে।
এখন দেখি অবিনাশীতাবাদ সূত্র কি? 'শক্তির সৃষ্টি কিংবা বিনাশ নেই। মহাবিশ্বের মোট শক্তির পরিমাণ নির্দিষ্ট। এটাকে বলা হয় শক্তির নিত্যতা সূত্র।' যেমন আপনি প্যাডেলে পায়ে শক্তি প্রয়োগ করলে সাইকেল গতিশক্তি প্রাপ্ত হবে, আপনি সুইচ টিপলে বিদ্যুৎ শক্তি আলোক শক্তিতে মানে লাইট জ্বলবে, আপনি চুলা জ্বলালে রান্না হবে, এক্ষেত্রে তাপ শক্তি রাসায়নিক শক্তিতে রূপান্তরিত হয়। এইভাবে সাধারণ এক শক্তি আরেক শক্তিতে রূপান্তরিত হয়। পদার্থ বিজ্ঞানের মতে শক্তি সৃষ্টিও হয় না আবার ধ্বংস ও হয় না, এক প্রকার শক্তি অন্য প্রকারে রূপান্তরিত হয়ে যায়।
এখন আসি আত্মার প্রসঙ্গে। যদিও বিজ্ঞান আজ পর্যন্ত আত্মার নামক কোন কিছুর অস্তিত্ব খুঁজে পায় নাই, তবুও গীতার আত্মা আর পরমাত্মা তত্ত্ব শক্তির অবিনাশীতাবাদ সূত্রের মানে বিজ্ঞান খুঁজে পেয়েছে। আত্মা যদি শক্তির আরেক নাম হয় তবে আমার শক্তি বেশি পিঁপড়ার শক্তি কম। আমি মরে গেলে আমার আত্মা কি পিঁপড়াতে যাবে নাকি পিঁপড়ার আত্মাটা নব্য কোন মানুষের শরীরে যাবে? যদি গিয়েই থাকে তবে একটা মানুষ পিঁপড়ার শক্তি দিয়ে করবে কি? আর একটা পুঁটি মাছের শক্তি দিয়ে হাতি কি করবে? পিঁপড়ার আত্মা আর মানুষের আত্মা কি এক? মানুষের শক্তি আর মানুষের আত্মার পরিমাণ কি এক? আত্মাকে আমরা শক্তি দিয়ে মাপব কেন? যদি ধরে নেই আত্মা আর শক্তি এক জিনিস, মানে যদি আমরা শক্তি দিয়ে আত্মা পরিমাপ করি, তবে প্রাণী বিশেষে শক্তির তফাৎ হওয়ার কথা না। আমার আর পিঁপড়ার শক্তি এক থাকার কথা যেহেতু আত্মা মাপে শক্তি দ্বারা। নাকি প্রাণী অনুযায়ী আত্মার কম বেশি হয়ে থাকে? মানুষের আত্মা বেশি পিঁপড়ার আত্মা কম, এমন? বিজ্ঞান থেকে শক্তি ধার করে এনে আত্মার সাথে গোঁজামিল দিলে হিসাবে কমবেশি এবং গড়মিল হচ্ছে। শক্তি যেমন এক রূপ থেকে অন্য রূপে পরিবর্তন হয় তেমনে আত্মার পরিবর্তনের রূপ কি? সে যায় কোন মাধ্যম দিয়ে? সে কি ঠাণ্ডা হয়ে, গরম হয়ে, আলোর মত ঝলকানি দিয়ে যায়? সে কিভাবেই বা যাতায়াত করে? আত্মার রূপ কি? আত্মার পরিমাপ করে কিভাবে? সর্বোপরি আত্মা মাপা হয় কোন এককের ভিত্তিতে?
তিন ছেলের পর মেয়ে জন্মানোয় বাবা মা বড্ড খুশি হয়েছিল। আদর করে নাম রেখেছিল অঞ্জলি। বাবা মা, ভাইদের কাছে একমাত্র আদরের ছোট বোন অঞ্জলি যাইই দাবী করতো তাই পেয়ে যেত। বলেতে গেলে সবাই মেয়েটিকে রাজকন্যার আদরে বড় করতে লাগলো । সব কিছুই ঠিকঠাক ছিল। একটু বড় হতেই, মানে ইন্টারমিডিয়েট পড়ার সময় থেকে মেয়ের বিয়ের জন্য বিভিন্ন জায়গা থেকে প্রস্তাব আসতে থাকলো। অঞ্জলির কথা ছিল আগে পড়ালেখা শেষ করবে, নিজের পায়ে দাঁড়াবে, এরপর ভেবে দেখবে। এরমধ্যে অনেক ভাল ভাল বিয়ের প্রস্তাবই মেয়েটির পরিবার ফিরিয়ে দিয়েছিল। পড়ালেখা শেষের পরপরই বাসা থেকে চাপ আসতে থাকলো বিয়ের। মেয়েটি সরাসরি জানিয়ে দিলো যে, সে বিয়ে প্রথায় বিশ্বাসী না। বিয়ে করা তার পক্ষে কোন ভাবেই সম্ভব না। যদি কারো সাথে থাকতে হয় তবে এমনিতেই বসবাস করতে পারে, এর জন্য বিয়ের মত চুক্তির দরকার হয় না। এর পেছনে তার যুক্তি ছিল, মতের অমিল হলে সম্পর্ক ভাঙ্গবেই, সেটা বিয়ে করলেও যা হবে- না করলেও তা হবে। বিয়ে ছাড়াও একসাথে বসবাস করা যায়। বিয়ে নামক চুক্তি দ্বারা ভালবাসা জিইয়ে রাখা যায় না। অঞ্জলির আরেকটি দাবী ছিল, বিয়ে করে তাকে তার বাড়ি ত্যাগ করতে হবে, এটা সে করতে পারবে না।
মেয়ের মুখে এমন কথা শুনে তার বাবা মা আর তার ভাইদের মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়লো। কিন্তু অঞ্জলি তার সিদ্ধান্ত জানিয়ে দিয়েছিল স্পষ্ট। দিন যেতে থাকে বিভিন্ন জায়গায় চাকরির জন্য চেষ্টা করেও তার কোন চাকরি মিলছিল না। ইতিমধ্যে আত্মীয় পাড়া প্রতিবেশীর মধ্যে জানাজানি হয়ে যায় অঞ্জলীর এমন নীতিবিরুদ্ধ, প্রথাবিরুদ্ধ মতের কথা। রাস্তা ঘাটে আগে যেইসব ছেলে সমীহ করতো, তারাও ইয়ার্কি মারা শুরু করলো, এমনকি ছোট ছেলেরাও। ঘরে গ্রহণযোগ্যতা কমতে কমতে একেবারে অবাঞ্ছিতের পর্যায়ে গিয়ে ঠেকল। একই বাবা মায়ের সন্তান হলেও তার বড় ভাই তখনো বিয়ে না করেও তার অবস্থানের এক চুল হেরফের হল না, অঞ্জলির অবস্থানের হল। দিনের পর দিনে পরিবারের সকল সদস্যের সাথে কথা বলা প্রায় বন্ধ হয়ে গেলো। তার কোন প্রয়োজনেও বাবা ভাই মা তাকে সাড়া দেয়াটা ছিল গলগ্রহের মত, অঞ্জলির দ্বারা এদের সাথে নিঃশ্বাস নেয়াটাও কষ্টের হয়ে উঠলো। মাঝে মাঝে মনে হতে লাগলো দু'চোখ যেদিকে যায় সেদিকেই চলে যাবে। যাই যাই করে আর তার যাওয়াটা আর হওয়াটা হয়ে উঠে না।
অঞ্জলি দুটো ছাত্র বাড়িতে পড়িয়ে যে টাকা পায় তা দিয়ে সে প্রতিমাসে কিছু বই কিনে। তার সময় কাটতো বই পড়ে, মাঝে মাঝে নিজেও কিছু লিখেটিখে, সেটা একান্তই নিজের মত করে, নিজের জন্যই, নিজের চিন্তা দর্শন হাবিঝাবি। কেউ জানে না তার মনের ভেতর কেমন উথাল পাতাল ভাঙ্গন চলতে থাকে। রাতের ঘুম কমতে থাকে, সাথে কমতে থাকে দিনের স্বচ্ছতা। মধ্যরাতের ট্রেনের বাঁশীর শব্দটা তাকে বরাবরই মাতাল করতো। সে রাতে তার মনে হলো, সমাজে বিয়ে ছাড়া যেহেতু নারী জন্মের কোন মানে নাই, তারও এই জীবন বাঁচিয়ে রাখার আর কোন মানে নাই। ট্রেন আসার শব্দ শুনতে শুনতে ঘরে থেকে সজ্ঞানে বের হয়ে সোজা বাঁশীর উপর ঝাঁপিয়ে পড়লো।
রেলের রাস্তায় পরদিন সকালে তার মরা, কাটা, চ্যাপ্টে যাওয়া দেহটা পাওয়া গেলো। অঞ্জলির আর বিয়ে করা হলো না। যদিও অঞ্জলি বিয়ে না করলে কোন ছেলের জীবন জলাঞ্জলি যেত না; তবুও সে মরে গেলো। অঞ্জলির বিয়ে হলো না ঠিকই কিন্তু একটা কিছু হলো, তা হলো-পরিবারের সদস্যরা মেয়ের পালনের ভার বহন করা থেকে চিরতরে মুক্তি পেলো।
(যথা সম্ভব আবেগ বর্জন করে লেখার চেস্টা।)